স্পোর্টস স্পেশাল: ফুটবল খেলায় বিশ্বজুড়ে কতশত তারকার জন্ম হয়েছে, কিন্তু কেউই পরিসংখ্যান আর রেকর্ডের পাতায় লিওনেল আন্দ্রেস মেসির মতো এতটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি। বার্সেলোনা থেকে শুরু করে পিএসজি, ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে মেসি যা করে দেখিয়েছেন, তা যেন রূপকথাকেও হার মানায়। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরবো ফুটবল ঈশ্বরের ক্যারিয়ারের সেই সমস্ত অবাস্তব ও অতিমানবীয় রেকর্ড, যা ভাঙা তো দূরের কথা, স্পর্শ করার কথা ভাবতেও বর্তমান প্রজন্মের যেকোনো ফুটবলারের বুক কেঁপে উঠবে।
১. ব্যালন ডি'অর ও ব্যক্তিগত ট্রফির একচ্ছত্র সাম্রাজ্য
ফুটবল দুনিয়ার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ মর্যাদার পুরস্কার হলো 'ব্যালন ডি'অর'। কোনো সাধারণ ফুটবলার ক্যারিয়ারে একটি ব্যালন ডি'অর পেলেই নিজেকে ধন্য মনে করেন। অথচ লিওনেল মেসি এই ট্রফিটি নিজের শোকেসে তুলেছেন রেকর্ড **৮ বার** (২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৩)। তাঁর ঠিক পেছনে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জিতেছেন ৫ বার। বিশ্লেষকদের মতে, মেসির এই ৮টি ব্যালন ডি'অরের রেকর্ড আগামী ১০০ বছরেও কেউ ভাঙতে পারবে কিনা তা নিয়ে চরম সন্দেহ রয়েছে।
এছাড়া ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু (ইউরোপের লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা) মেসি জিতেছেন রেকর্ড **৬ বার**। ফিফা বর্ষসেরা প্লেয়ারের খেতাব (The Best FIFA Men's Player) এবং পিচিচি ট্রফি জয়ের দিক থেকেও তাঁর ধারেকাছে কেউ নেই।
মেসির ক্যারিয়ারের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান ও অল-টাইম রেকর্ড চার্ট
| পুরস্কার / টুর্নামেন্ট / ক্যাটাগরি | রেকর্ডের সংখ্যা / ডেটা | বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসে স্ট্যাটাস |
|---|---|---|
| ব্যালন ডি'অর (Ballon d'Or) | ৮ বার | সর্বকালের সর্বোচ্চ (World Record) |
| ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু | ৬ বার | সর্বকালের সর্বোচ্চ (World Record) |
| এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে অফিশিয়াল গোল (২০১২) | ৯১ গোল | গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড (সর্বোচ্চ) |
| এক মৌসুমে ক্লাব গোল (২০১১-১২) | ৭৩ গোল | বিশ্ব ফুটবলের অল-টাইম রেকর্ড |
| সর্বমোট ক্যারিয়ার অফিশিয়াল ট্রফি | ৪৬টি | ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ ট্রফি জয়ী খেলোয়াড় |
| এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ অফিশিয়াল গোল | ৬৭২ গোল | বার্সেলোনার হয়ে (ভাঙলেন পেলের সান্তোসের রেকর্ড) |
| লা লিগায় সর্বকালের সর্বোচ্চ গোল | ৪৭৪ গোল | স্প্যানিশ ফুটবল ইতিহাসের অল-টাইম রেকর্ড |
| লা লিগায় সর্বকালের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট | ১৯২টি | স্প্যানিশ ফুটবল ইতিহাসের অল-টাইম রেকর্ড |
| বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা | ২৬টি ম্যাচ | বিশ্বকাপ ইতিহাসের অল-টাইম রেকর্ড |
| বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোল্ডেন বল জয় | ২ বার (২০১৪, ২০২২) | ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে এই কীর্তি |
| আন্তর্জাতিক ফুটবলে লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ গোল | ১০৯+ গোল | লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অল-টাইম রেকর্ড |
| কোপা আমেরিকার ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট | ১৮টি | কোপা আমেরিকার অল-টাইম রেকর্ড |
২. ২০১২ সালের সেই অবাস্তব ৯১ গোলের গিনেস রেকর্ড
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বছর ছিল ২০১২। সেই একটি মাত্র ক্যালেন্ডার ইয়ারে বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসি গোল করেছিলেন মোট **৯১টি**! তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালে জার্মান কিংবদন্তি জার্ড মুলারের করা ৮৫ গোলের মহাকীর্তি। আধুনিক ফুটবলে যেখানে একটি পুরো মৌসুমে ৩০-৪০টি গোল করতেই স্ট্রাইকারদের কালঘাম ছুটে যায়, সেখানে মেসি এক বছরে ৯১ গোল করে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম চিরস্থায়ীভাবে লিখিয়ে নিয়েছেন। এই ৯১ গোলের মধ্যে তিনি বার্সেলোনার হয়ে ৭৯টি এবং আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১২টি গোল করেছিলেন।
Embed from Getty Images৩. আন্তর্জাতিক ও ফিফা বিশ্বকাপ মঞ্চের অল-টাইম মহাকীর্তি
দীর্ঘদিন যাবৎ মেসির সমালোচকরা বলতেন যে তিনি দেশের হয়ে বড় কোনো ট্রফি জিততে পারেন না। কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে দৃশ্যরপট পুরোপুরি বদলে যায়। একে একে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং সর্বশেষে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল ইতিহাসের "সর্বকালের সেরা" বা GOAT বিতর্কের অবসান ঘটান তিনি। আন্তর্জাতিক ও বিশ্বকাপ মঞ্চে তাঁর অন্যান্য অনন্য রেকর্ডগুলো হলো:
- বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ ও মিনিট: বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ (২৬টি) খেলার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মিনিট মাঠে থাকার রেকর্ডও মেসির।
- দুইবার গোল্ডেন বল: ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০১৪ এবং ২০২২) টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়ে 'গোল্ডেন বল' জেতার অনন্য রেকর্ড গড়েন তিনি।
- সব স্টেজে গোল করার বিশ্বরেকর্ড: কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড অফ সিক্সটিন, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল—একটি সিঙ্গেল বিশ্বকাপের প্রতিটি নকআউট ম্যাচে গোল করার একক কৃতিত্ব শুধু মেসিরই আছে।
- বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যান অফ দ্য ম্যাচ: ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড ১৪ বার ম্যাচ সেরা (Man of the Match) নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
- আর্জেন্টিনার অল-টাইম টপ স্কোরার: আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ ১৩টি গোল নিয়ে তিনি গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার রেকর্ড ভেঙে শীর্ষে অবস্থান করছেন।
- দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা: আন্তর্জাতিক ফুটবলে লাতিন আমেরিকার (CONMEBOL) ইতিহাসে পেলেকে ছাড়িয়ে ১০৯টিরও বেশি গোল নিয়ে তিনি এখন সবার উপরে।
৪. স্প্যানিশ লা লিগা ও বার্সেলোনা অধ্যায়ের অতিমানবীয় কীর্তি
বার্সেলোনার হয়ে মেসি যে সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, তা স্পেনের ফুটবলে রূপকথা হয়ে থাকবে। লা লিগার ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা (**৪৭৪ গোল**) এবং একই সাথে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা (**১৯২টি**)। বার্সেলোনার দীর্ঘ ট্রফি খরা কাটিয়ে তিনি ক্লাবটিকে এনে দিয়েছেন ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ১০টি লা লিগা খেতাব।
- টানা ২১ ম্যাচে গোল: লা লিগার ২০১২-১৩ মৌসুমে টানা ২১টি অফিশিয়াল ম্যাচে ৩৩টি গোল করার অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড গড়েন মেসি, যা ফুটবল ইতিহাসে আর কোনো স্ট্রাইকার কোনো লিগে করতে পারেননি।
- এক ম্যাচে ৫ গোল (ইউসিএল): চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে নকআউট পর্বের একটি একক ম্যাচে (বায়ার লেভারকুসেনের বিরুদ্ধে) ৫টি গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি।
- সর্বাধিক হ্যাটট্রিক: লা লিগার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি (৩৬টি) হ্যাটট্রিক করার রেকর্ডও মেসির নামের পাশেই শোভা পাচ্ছে।
- এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ ট্রফি: বার্সেলোনার হয়ে মেসি সর্বমোট ৩৫টি অফিশিয়াল ট্রফি জিতেছেন, যা স্প্যানিশ ফুটবলে একক কোনো ক্লাবের হয়ে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ অর্জন।
৫. পিএসজি ও ইন্টার মায়ামির নতুন অধ্যায়
বার্সেলোনা ছাড়ার পর পিএসজিতে গিয়েও মেসি ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান ট্রফি জয় করেন এবং ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড ধারা বজায় রাখেন। এরপর ২০২৩ সালে আমেরিকার ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়েই পুরো যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল কালচার বদলে দেন এলএম১০। মায়ামিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম অফিশিয়াল ট্রফি (লিগস কাপ) এনে দিয়ে তিনি ফুটবল ইতিহাসের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ট্রফি (৪৬টি) জয়ের অল-টাইম রেকর্ডটি নিজের একক দখলে নেন (তিনি ছাড়িয়ে যান সতীর্থ দানি আলভেসকে)।
অনেকেই মনে করেন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সাথে মেসির যে দেড় দশকের দ্বৈরথ ছিল, সেটিই মেসিকে প্রতিদিন ছাড়িয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবে সামগ্রিক ট্রফি, প্লে-মেকিং ইমপ্যাক্ট, গোল-টু-ম্যাচ রেশিও এবং অ্যাসিস্টের দিক থেকে মেসি ফুটবল বোদ্ধাদের চোখে অনেক আগেই পূর্ণতা পেয়েছেন। ২০২৬ সালের এই সময়ে এসেও ইন্টার মায়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়ে চলছেন এই মহাতারকা। ফুটবল বিশ্ব হয়তো আর কখনো এমন একজন নিখুঁত প্লে-মেকার ও ফিনিশারের কম্বিনেশন দেখতে পাবে না।